গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি
নতুন বছরের শুরুতে জেলায় এলপিজি সিলিন্ডারের বাজার তেঁতে ওঠে। ১২ কেজির সিলিন্ডার গ্যাস দেড় হাজার থেকে এক হাজার ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
ডিলাররা বলছেন, সরকার গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে। এ ছাড়া চাহিদার তুলনায় কোম্পানিগুলো কম গ্যাস সিলিন্ডার সরবরাহ করছে। গ্যাস পরিবহনে খরচ বেড়েছে। এ কারণে বাজারে গ্যাস সংকটের পাশাপাশি দাম বেড়েছে।
ক্রেতারা জানিয়েছেন, প্রতি সিলিন্ডার গ্যাস দেড় হাজার থেকে এক হাজার ৮০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। ডিলার বা খুচরা বিক্রেতার কাছে গিয়ে অধিকাংশ সময় গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে তারা বেশি দামে গ্যাস বিক্রি করছেন। এতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় ব্যয় বেড়েছে। অনেকে কাঠের চুলা ব্যবহারের চিন্তা করছেন।
তারা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে এলপিজির বাজার নিয়ন্ত্রণের দাবি জানিয়েছেন।
কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-ক্যাব গোপালগঞ্জ জেলার তথ্য মতে, জেলার পাঁচ উপজেলার এক লাখ ৩০ হাজার পরিবার ও দুই হাজার হোটেল-রেস্তোরাঁ ও চায়ের দোকানে এলপি গ্যাস ব্যবহৃত হয়ে আসছে। হঠাৎ করে অস্বভাবিকভাবে গ্যাসের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় ব্যবহারকারীরা বিপাকে পড়েছেন।
রোববার বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন-বিইআরসি বহুল ব্যবহৃত ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম জানুয়ারি মাসের জন্য এক হাজার ৩০৬ টাকা নির্ধারণ করেছে। তারপরও বাজারে এর কোনো প্রভাব পড়েনি।
টিএমএসএস, সেনা গ্যাসের ডিলার শহরের মন্দারতলা এলাকার সিকদার এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. সাইফুল ইসলাম ওসমান সিকদার বলেন, কোম্পানি ঠিকমতো গ্যাস সরবরাহ করছে না। প্রতিদিন ২৫০ থেকে ৩০০ সিলিন্ডার গ্যাস বিক্রি করি। কোম্পানি এখন সপ্তাহে ১০০ সিলিন্ডারও দিচ্ছে না। ৪০-৫০ সিলিন্ডার দিয়ে কোম্পানি গাড়ি পাঠিয়েছি। এতে সিলিন্ডার প্রতি যাতায়াত খরচ ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা পড়েছে।
ডিলার বলেন, “এরই মধ্যে বসুন্ধরা, বেক্সিমকোসহ বড় বড় কোম্পানি গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে। তাই এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।”
“২৫ ডিসেম্বর থেকে কোম্পানি গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে দেয়। এখানো এটি অব্যাহত রয়েছে। ভ্রাম্যমাণ আদালত এসে আমাদের কাছে মেমো দেখতে চায়। দেখাতে না পরালে মোটা অংকের জরিমানা করে। কিন্তু যারা গ্যাস সরবরাহ করছে না। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় না।”
শহরের চাঁদমারী এলাকার খুচরা গ্যাস বিক্রেতা অলিফ সিকদার গ্যাস সংকট ও বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রির কথা স্বীকার করে বলেন, “ডিলারের কাছে ২৫টা গ্যাস চাইলে, সরবরাহ করে পাঁচ-ছয়টা। দেড়শ থেকে ২০০ টাকা বেশি দিয়ে গ্যাস কিনতে হচ্ছে। তাই বাড়িয়ে বিক্রি করছি। ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করা যাচ্ছে না।”
শহরের বেদগ্রাম এলাকার গ্যাস ক্রেতা নাজমুল সরদার বলেন, “এখানে সরকার নির্ধারিত মূল্যে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। প্রতি সিলিন্ডার গ্যাসের জন্য ২০০ থেকে ৫০০ টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে। এখানে ডিলাররা গ্যাসের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করেছে।
“এ ছাড়া খুচরা বিক্রেতারা সিন্ডিকেট করে প্রতি সিলিন্ডার গ্যাস দেড় হাজার থেকে এক হাজার ৮০০ টাকা দরে বিক্রি করছে। এভাবে তারা অতিরিক্ত মুনাফা হাতিয়ে নিচ্ছে। এতে আমাদের জীবনযাত্রায় ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে।”
শহরের মান্দারতলার হোটেল ব্যবসায়ী আজিজুল ইসলাম বলেন, “দাম বাড়ায়, গ্যাসের খরচ অনেক বেড়েছে। তাই হোটেল-রোস্তারাঁ ব্যবসায় লাভ কমেছে। এ কারণে কাঠের চুলা চালুর উদ্যোগ নিয়েছি। গ্যাস না কিনে এখন কাঠ কেনার চেষ্টা করছি।”
শহরের মোহাম্মদ পাড়ার বাসিন্দা গ্যাস ব্যবহারকারী সৌরভ বিশ্বাস বলেন, “গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাজার থেকে গ্যাস উধাও হয়ে গেছে। গ্যাসের জন্য বিভিন্ন জায়গায় ধরণা দিতে হচ্ছে। অধিকাংশ খুচরা গ্যাস বিক্রেতার কাছে গ্যাস নেই। যা দু-একটা পাওয়া যাচ্ছে, তারা দেড় হাজার থেকে এক হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত দাম হাকাচ্ছে। যার কাছ থেকে যা নিতে পারে, এমন দামে গ্যাস বিক্রি করছে।”
ক্যাব গোপালগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি মো. মোজহারুল ইসলাম বাবলু বলেন, “বাজারে প্রতি সিলিন্ডার গ্যাস ১৪০০ থেকে ১৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিক্রেতা ক্রেতার কাছ থেকে ইচ্ছামত দাম নিচ্ছে বলেও আমরা তথ্য পেয়েছি। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে সঙ্গে নিয়ে সোমবার থেকে এটি নিয়ন্ত্রণে আমরা কাজ শুরু করেছি।”
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের গোপালগঞ্জ জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক সৈয়দা তামান্না তাসনীম অতিরিক্ত দামে গ্যাস বিক্রির কথা স্বীকার করেন।
তিনি বলেন, “আমরা গ্যাসের বাজার নিয়ন্ত্রণে অভিযান শুরু করেছি। সোমবার অভিযান চালিয়ে গ্যাস ডিলার নিপুণ প্রযুক্তিকে ১৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। সেখানে গ্যাস ক্রয় ও বিক্রয় মূল্যের মধ্যে ব্যাপক ব্যবধান পাওয়া গেছে।
“গ্যাসের বাজার নিয়ন্ত্রণে আমাদের এ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। বাজার নিয়ন্ত্রণ না হওয়া পর্যন্ত অভিযান চলবে"

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন