শরীয়তপুরের ডামুড্যা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে রোগীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। সরকারি এই স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে বরাদ্দকৃত ওষুধ রোগীদের না দিয়ে বাইরে থেকে কিনতে বাধ্য করা হয়। হাসপাতালে গেলে বিনামূল্যে চিকিৎসা ও ওষুধ পাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা মেলে না। অনেক সময় মেয়াদোত্তীর্ণ বা মানহীন ওষুধ হাতে তুলে দেওয়া হয়। জরুরি সেবার জন্যও টাকা দাবি করা হয়। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অপারেশন থিয়েটার দীর্ঘদিন কার্যত অচল। বেশিরভাগ পরিক্ষা করানো হয় বাহিরের ক্লিনিক থেকে। ডামুড্যা ৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে উপজেলার মানুষ ছাড়াও আশপাশের উপজেলার মানুষও সেবা নিতে আসে। হাসপাতালে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে ক্রয়কৃত যন্ত্রপাতি ব্যবহার না হওয়ায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এক্স-রে ফিল্ম না থাকার অজুহাতে সেটিও বন্ধ রয়েছে। আল্ট্রাসনোগ্রাফি মেশিন থাকলেও সেটিও ব্যবহার হয় না। হাসপাতালের জুনিয়র ও সিনিয়র কনসালট্যান্ট থাকলেও তারা নিয়মিত বহির্বিভাগে বসেন না। সপ্তাহে দুইদিন হাসপাতালে আসলেও সেটি নির্ধারিত সময়ের পর আসেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। রাত ৮ টার পরে হাসপাতালের সবরকম সেবা বন্ধ থাকার অভিযোগ রয়েছে।
হাসপাতাল ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৮৫ সালে ৩১ শয্যাবিশিষ্ট ডামুড্যা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হয়েছে। পরে উন্নত চিকিৎসা দিতে সেটিকে ৫০ শয্যাশায় উন্নীত করা হয়েছে। ১,১৬,৬৪৩ জনসংখ্যার এই উপজেলায় একটি মাত্র সরকারি হাসপাতাল। তবে এখানেও মিলছে না উন্নত চিকিৎসা সেবা। কর্তৃপক্ষের অবহেলা, অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম আর দুর্নীতির কারণে সরকারি হাসপাতাল এখন রোগীদের ভোগান্তির প্রতীক হয়ে উঠেছে। বহির্বিভাগের রোগী ও তাদের স্বজনরা চিকিৎসকের অপেক্ষায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে আছে। বহির্বিভাগের এনসিডি কর্নারের কার্ডধারী রোগীরাও ফিরে যাচ্ছেন ওষুধ না পেয়ে। হাসপাতালের দ্বিতীয় তলায় ওঠার সিঁড়ি ময়লা-আবর্জনায় ভরা। রোগীর পাশেই মেঝেতে ময়লার দাগ, দেয়ালের কোথাও কোথাও কফ, থুতু ও পানের পিকের দাগ। পুরুষ ও মহিলা ওয়ার্ডের টয়লেট ব্যবহার অনুপযোগী। রাতে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর হাসপাতালে ভর করে ভুতুড়ে পরিবেশ। ফলে বাধ্য হয়ে মোবাইলের টর্চ জালিয়ে চিকিৎসা দিতে হয় নার্স ও চিকিৎসকদের। হাসপাতালের পিছনে ময়লা ও জমাট বাঁধা দুর্গন্ধ পানির কারণে মশার উপদ্রপও বেড়েছে। ওয়ার্ডের অধিকাংশ ফ্যান নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। তবে এসব বিষয়ে চাকরি হারানো ও বদলির ভয়ে চিকিৎসক, নার্স, কর্মচারীসহ হাসপাতালের কেউ কথা বলতে রাজি হয়নি।
অভিযোগ রয়েছে উপজেলাটির বর্তমান স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ শাহ্ আলম সিদ্দিকীর অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে হাসপাতালের চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত সাধারণ মানুষ। নিয়মিত অফিসে আসেন না তিনি। সরকারি গাড়ি ব্যক্তিগত ভাবে ব্যবহার ও নিজের ব্যক্তিগত ড্রাইভারের বেতন হাসপাতাল থেকে পরিশোধ করেন। হাসপাতালের টেন্ডার নিজের অর্থের বিনিময়ে ব্যক্তিগত মানুষদের পাইয়ে দেন। ২০২৪-২০২৫ অর্থ বছরের টেন্ডারের ঔষধ বুঝে না নিয়েই কমিশনের মাধ্যমে ঠিকাদারকে বিল পরিশোধ করেন তিনি। হাসপাতালের মেরামতের টাকা কাজ শেষ হওয়ার আগেই তুলে নেন তিনি। রুগী ও স্টাফদের সাথে প্রতিনিয়ত খারাপ আচরণ করা নিত্যদিনের ঘটনা। এর আগে মানিকগঞ্জের দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দায়িত্ব পালনকালে ও ছাত্রলীগের রাজনীতিতে জড়িত থাকায় সাবেক স্বাস্থ্য মন্ত্রী ডা: জাহিদ মালেকের সাথে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করে নিজেকে স্বাস্থ্য মন্ত্রীর ভাগ্নে পরিচয়ে দিয়ে চিকিৎসকদের সংগঠন ইউএইচএফপিও ফোরামের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়। নির্বাচিত হয়ে শুরু করেন বেপরোয়া তদবির বানিজ্য। দু’হাতে কামিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। চলাফেরা করেন বিলাসবহুল গাড়িতে। নিজেকে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ নেতা দাবী করা শাহ্ আলম সিদ্দিকীর হাত ধরেই বাংলাদেশ বিভিন্ন উপজেলায় প্রায় শত,শত বদলি বানিজ্য সহ হয়েছে নিয়োগ বানিজ্যও। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পরে কিছুদিন চুপচাপ থাকলেও এখনো নিয়মিত আওয়ামী লীগের পক্ষে তার ফেসবুকে পোস্ট করেন। এছাড়াও হাসপাতালে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নিয়ে মাঝে মধ্যে গোপন বৈঠকের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। শাহ্ আলম সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, জেলা সিভিল সার্জন সহ বিভিন্ন জায়গায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন ভুক্তভোগী কয়েকজন। এবিষয়ে নারায়ণগঞ্জ ৩০০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ককে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি করেছে মন্ত্রণালয় । তার অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে তদন্ত চলমান রয়েছে।
শাহ্ আলম সিদ্দিকীর সাবেক কর্মস্থলের সহকর্মী তোফায়েল আহমেদ বলেন, আমাদের দৌলতপুরে থাকাকালীন স্বাস্থ্য মন্ত্রীর ভাগ্নে পরিচয়ে ডাক্তারদের পছন্দের জায়গায় বদলি, হাসপাতালে আউটসোর্সিং নিয়োগ, টাকার বিনিময়ে মেডিক্যাল সার্টিফিকেট, টেন্ডার বানিজ্য সহ একাধিক অভিযোগ থাকলেও ভয়ে কেউ মুখ কথা বলতো না। কেউ প্রতিবাদ করলে তাদের চাকরি থেকে অব্যহতি অথবা বদলি করে দিতো। তিনি সবসময় ভয় দেখাতো ডিজি অফিস তার কথায় চলে স্বাস্থ্য মন্ত্রী তার আত্মীয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডামুড্যা হাসপাতালের একাধিক স্টাফ বলেন, ওনি নিজের খেয়ালখুশি মতো হাসপাতালে আসেন এবং চলে যায়। আমাদের যেসকল সরকারি ঔষধ দেয় সেটার মান ভালো না। তাকে জানালে সে আমাদের বলে এগুলো দিয়ে চালিয়ে দাও। পরিক্ষা নিরিক্ষার যন্ত্রাংশ ঠিক করার কথা বললে বাহির থেকে রোগিদের পরিক্ষা করিয়ে আনতে বলে। এখানে গরীব মানুষ চিকিৎসা নিতে আসে মাঝে মধ্যে আমাদের খুব খারাপ লাগে কি করবো বলেন আমরা ভয়ে কথা বলতে পারি না।হাসপাতালের জেনারেটর রয়েছে তা চালানো হয় না। বিদ্যুৎ চলে গেলে গরমে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয় রোগীদের। অন্ধকারে রোগীদের ওষুধ দেয়া থেকে শুরু করে জরুরি সেবা ব্যাহত হয়। তখন মোবাইলের আলো জ্বালিয়ে কাজ করতে হয়। সরকার প্রতিবছরই বাজেট দেয় কিন্তু ওনি ঠিকঠাক মতো খরচ না করে বিল উত্তলন করে নিয়ে যায়। নিজে পছন্দের ঠিকাদারদের মাধ্যমে মালামাল কিনে আনে। মালামাল খুব নিন্ম মানের এগুলো রুগীদের শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
হাসপাতালে আসা কাজল বলেন, ‘অসুস্থ মেয়েকে নিয়ে দুইদিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি। না দিচ্ছে ঔষধ না চিকিৎসা সবকিছুই বাহির থেকে কিনে আনতে হয়। তাদের কাছে সাধারণ ক্যনলা সেটাও নেই। আসার পর থেকেই খাবার ও পানি কম খাচ্ছি যাতে টয়লেটে না যেতে হয়। টয়লেটে গিয়ে এখন নিজেই অসুস্থ হওয়ার উপক্রম। এখানে সেবা বলতে কিছু নেই।
ধানুকাঠি থেকে আসা রোগীর স্বজন সাজেদা বেগম বলেন, ‘এই হাসপাতাল নিজেই অসুস্থ, দুর্বল। ওয়ান টাইম টেপটা পর্যন্ত বাইরের ফার্মেসি থেকে কিনে এনেছি। তুলা থাকতেও বের করতে চায় না নার্সরা। নাতিনকে হাসপাতালে আনার পর দুই আড়াই ঘণ্টা কারেন্টের কোনো খবর নেই। পরে ছেলেকে বলে বাড়ি থেকে চার্জার লাইট এনেছি।
ভর্তি থাকা রোগী আনিস ছৈয়াল বলেন, ‘হাসপাতালের টয়লেটে যাওয়ার মত অবস্থা নেই। পুরুষদের টয়লেটে কমন একটি লাইট থাকলেও প্রতিটি টয়লেটে আলাদা কোনো লাইটের ব্যবস্থা নেই। ফলে মূল দরজা বন্ধ করে প্রয়োজন সারতে হয়। আমরা বললেও কাজ হয় না। হাসপাতালের পরিবেশ এতটাই নোংরা যে এখানে এক মিনিট টিকে থাকা কষ্টকর। নিরুপায় হয়ে রোগী ও স্বজনেরা কোনো রকমে এখানে সময় পাড় করছেন।
মন্ত্রণালয় লিখিত অভিযোগে ছাত্র সমন্নয়ক এর পক্ষে সাক্ষর করা সাদ আল সাইফ বলেন,শাহ্ আলম সিদ্দিকীর দাপটে ডামুড্যার স্বাস্থ্যসেবা কার্যত ভেঙে পড়েছে। সরকারি হাসপাতালে এসে সাধারণ মানুষ চিকিৎসা পাচ্ছে না, বরং নানা কৌশলে তাদের বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠানো হচ্ছে। এতে গরিব রোগীরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। ঔষধ, মালামাল কেনাকাটা সহ বিভিন্ন অনিয়মের সাথে জড়িত তিনি। আমরা একাধিকবার সংশ্লিষ্ট দপ্তরে অভিযোগ জানিয়েছি তদন্ত কমিটি হয়েছে। কিন্তু রহস্যজনক কারণে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। দ্রুত তদন্ত করে তার বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নিলে আমরা কঠোর কর্মসূচিতে যেতে বাধ্য হবো।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (টিএইচও) ডাঃ শাহ্ আলম সিদ্দিকী বলেন, ‘সমস্যার কথা কেউ না জানালে সমাধান কিভাবে করবো। এছাড়া লোকবল সংকট রয়েছে। তাই চিকিৎসা সেবা দিতে সমস্যা হচ্ছে। তবে তার বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয় জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যায়। এবং তিনি এই অভিযোগের ব্যাপারে তদন্ত কমিটির সাথে কথা বলবেন বলেও জানান।
এসব অভিযোগের ব্যাপারে জেলা সিভিল সার্জন ডাঃ মোঃ রেহান উদ্দিন বলেন, তার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ পাওয়া গেছে। এবিষয়ে ইতিমধ্যেই মন্ত্রণালয় তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। আসা করছি সঠিক সময়ের মধ্যে মন্ত্রণালয়ে রিপোর্ট দাখিল করা হবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন